দৈনিক ভোলা টাইমস্
|
দৌলতখান কৃষি

স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও বিদ্যুৎহীন মনপুরা

স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও বিদ্যুৎহীন মনপুরা
  ষ্টাফ রিপোর্টার: স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে। দেশ এগিয়েছে, শহর আলোকিত হয়েছে, গ্রাম পৌঁছেছে উন্নয়নের ছোঁয়ায়। কিন্তু ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরা যেন এখনো পড়ে আছে অন্ধকারেই-আক্ষরিক অর্থেই। বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার প্রায় ৩৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলায় বসবাস করেন প্রায় ১ লাখ মানুষ। তাদের জীবনের প্রতিটি সন্ধ্যা নামে এক অদৃশ্য অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করে। জানা গেছে, মনপুরা উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে কেবল ২নং হাজিরহাট ইউনিয়নে ওজোপাডিকোর জেনারেটর নির্ভর বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। তাও দিনে গড়ে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। বাকি চারটি ইউনিয়নে এখনো পৌঁছায়নি বিদ্যুতের কোনো আলো। পুরো উপজেলাই যেন একটি বড় “সোলার নির্ভর দ্বীপে” পরিণত হয়েছে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে থমকে যায় জীবন। বাজারের কোলাহল কমে আসে, ঘরবাড়িতে জ্বলে ওঠে ক্ষীণ সোলার বাতি, কোথাও কোথাও এখনো জ্বলে কেরোসিনের কুপি ঝড়। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মেহেদী হাসান বলেন, দিনে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যবসা চলে না। জেনারেটরের খরচ বেশি, তাই অনেক সময় বিকেলেই দোকান বন্ধ করতে হয়। শুধু ব্যবসা নয়, অন্ধকারে থেমে যায় শিক্ষার আলোও। শিক্ষার্থী তামজিদ সামি জানায়, রাতে পড়তে বসলে সোলারের চার্জ শেষ হয়ে যায়। তখন আর কিছু করার থাকে না। অনলাইন ক্লাস বা কম্পিউটার ব্যবহার করাও কঠিন। স্বাস্থ্যসেবাও এখানে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুতের অভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি চালানো যায় না নিয়মিত। ওষুধ সংরক্ষণেও তৈরি হয় জটিলতা। একটি দ্বীপ অঞ্চলের জন্য যেখানে কোল্ড স্টোরেজ, বরফ কারখানা বা মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-সেখানে বিদ্যুতের অভাবে এসব কিছুই গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে, সোলার প্যানেল এখন অনেক পরিবারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু এই সীমিত প্রযুক্তি দিয়ে আলো ও মোবাইল চার্জ ছাড়া আর তেমন কিছুই সম্ভব নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে মনপুরাকে জাতীয় গ্রিডের আওতায় আনার আশ্বাস শোনা গেলেও বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রকল্পের কথা আছে, পরিকল্পনার কথা আছে, কিন্তু নেই বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) নূর আহমদ জানান, মনপুরাকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে এবং ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের একটি টিম এলাকা পরিদর্শন করেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, পরিকল্পনা আর বাস্তবতার এই দূরত্ব কতদিন ? এদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে সোলার মিনি গ্রিড কেন্দ্রে তালা ঝুলিয়েছে গ্রহকরা। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে মনপুরার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুরে সোলার মিনি গ্রিড কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। গ্রহকরা জানান, ২০১৯ সালে মনপুরা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুরে এ সোলার গ্রিড কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়। বর্তমানে প্রায় এক হাজার গ্রহক রয়েছে। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও শুরু থেকেই লোডশেডিং ছিলো। কিন্তু গত ঈদের সময় থেকে এখন পর্যন্ত ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে না। বিষয়টি কর্মকর্তাদের জানালেও কোনো সমাধান হয়নি। তাই স্থানীয় ভুক্তভোগীরা মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালের দিকে গ্রহকরা ওই অফিস ঘেরাও করে। পরে অফিসের স্টাফদের বের করে গেটে তারা ঝুলিয়ে দেয়। এ ব্যাপারে ওই প্রকল্প পরিচালক মো কাইয়ুম বাপ্পি জানান, রোজার ঈদের পর থেকে ঠিকমত ডিজেল পেতাম না। যার কারণে দিনের বেলা বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়নি। সোলারে চার্জ অনুযায়ী বিদ্যুৎ পেতেন গ্রহকরা। যার কারণে লোডশডিং হতো। এখন তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। আমরা গ্রহকদের ধর্য্য ধরতে বলেছি, কয়েকদিনের মধ্য স্বাভাবিক করার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বেশ কিছু গ্রহক অফিসে এসে বিদ্যুৎ লাগবে না বলে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বের করে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। দেশ যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি করছে, তখন একটি সম্পূর্ণ উপজেলাকে অন্ধকারে রেখে সেই উন্নয়নের গল্প কতটা পূর্ণতা পায় ? স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে যাওয়া এক জনপদের মানুষের কণ্ঠে আজ একটাই প্রশ্ন-মনপুরার জন্য কি সত্যিই কারও মন পোড়ে না ? কবে জ্বলবে জাতীয় গ্রিডের আলো এই দ্বীপে ?