আদিল হোসেন তপু:
ঈদুল আজহা উপলক্ষে জমে উঠতে শুরু করেছে ভোলার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে দেড় শতাধিক পশুর হাট। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন হাটে বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। তবে এসব হাটের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও ঐতিহ্যবাহী হিসেবে পরিচিত ভোলা সদর উপজেলার গজারিয়া পশুর হাট, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মিয়া বাড়ীর দরজার হাট’ নামে বেশি পরিচিত।
প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী হাটে সপ্তাহে তিনদিন পশুর হাট বসে। প্রতিটি হাটে কয়েক কোটি টাকার গরু, মহিষ ও ছাগল কেনাবেচা হয়। তবে এই হাটের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এখানে ক্রেতা কিংবা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল, খাজনা বা চাঁদা নেয়া হয় না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে গিয়ে মানুষ নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কেনাবেচা করতে পারেন।
খোলা পরিবেশ, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, নিরাপদ বেচাকেনা এবং অতিরিক্ত খরচ না থাকায় গজারিয়া পশুর হাট এখন ভোলাসহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঈদকে সামনে রেখে প্রতিদিনই বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, আর প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠছে ঐতিহ্যের এই পশুর হাট। প্রতি হাটে বিক্রি হয় কয়েক কোটি টাকার গরু-ছাগল।
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ভোলা সদর উপজেলার উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে অবস্থিত গজারিয়া বাজারসংলগ্ন বালিয়া মিঞা বাড়ির সামনের খোলা মাঠে বসে এ পশুর হাট।
দালাল ও খাজনা মুক্ত হওয়ায় জেলার চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, দৌলতখান চরপাতা ও ভোলা সদরের ভেলুমিয়া, আলীনগর, চরসামাইয়া, বাঘমারা, রাজাপুর, চর চন্দ্রপ্রসাদ, এলাকা থেকে নানা প্রজাতের কোরবানির দেশি গরু, ছাগল বাজার সয়লাব হয়ে যায়। এখানে ছোট, বড়, মাঝারি তথা সব ধরনের পশু পাওয়া যায় বলে মাঠ ভর্তি উপচেপড়া ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে কোরবানির হাট। হাট ছাড়িয়ে রাস্তাঘাটসহ আশপাশের এলাকাগুলোও পূর্ণ হয়ে যায় পশুতে। তাই হাটের আগের দিন বিক্রেতারা মাঠে খুঁটি পুঁতে জায়গা নির্ধারণ করেন।
দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতা ও ব্যাপারীরাও পছন্দের পশুটি কিনতে এ হাটে যায়। বাজার দরের সঙ্গে সংগতি রেখেই পছন্দের পশুটি ক্রয় করতে পারেন ক্রেতারা। তাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই। ঈদের আগেভাগে ক্রয় করা পশু বাড়িতে পৌঁছে দিতেও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
গজারিয়া হাটে গরু নিয়ে যাওয়া লোকমান হোসেন বলেন, ‘গজারিয়া বাজার ভোলার ঐতিহ্যবাহী কোরবানির পশুর হাট। মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর পূর্বপুরুষরা এই হাট খাজনা ফ্রি করে দিয়ে গেছেন, তাই আমরা এই হাটে গরু নিয়ে আসি। আমরা গরু বিক্রেতারা এই বাজারে গরু বিক্রি করতে পারলে আমাদের খাজনা কিংবা চাঁদা দেয়া লাগেনা। বিক্রি করে পরিপূর্ণ অর্থটাই পাই। কোন দালাল নাই।’
ভেলুমিয়া থেকে গরু নিয়ে যাওয়া রমিজল ব্যাপারী বলেন, ‘এই হাটে সপ্তাহে শনি, সোম ও বুধবারে হাট বসে। কোনো চাঁদাবাজি নাই, খাজনা নাই।’
খামারি মাহফুজ জানান, ‘এই হাটে আশেপাশের ইউনিয়ন ও চরের গরু ওঠে। তাই দেশী গরু হওয়ায় ক্রেতারা এখান থেকে কিনেন খুব স্বাচ্ছন্দ্যে। এছাড়া আমরা অন্য হাটে একটা গরু বিক্রি করলে লাখে ৫ হাজার টাকার মতো খাজনা দেয়া লাগে। এখানে সম্পূর্ণ খাজনা ফ্রি। তাই ক্রেতা বিক্রেতা উভয় কেনা-বেচা করে খুশি।’
বিক্রেতা আলমগীর ব্যাপারী জানান, ‘খাজনা নাই, গরু বেচাকেনা ভালো হয়। এই পশুর হাট অনেক পুরাতন। মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জু মিঞার বাপ-দাদারা এই হাটকে খাজনামুক্ত কোরবানির হাট করেন।’
ক্রেতা সোয়েব বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর এ হাট থেকেই গরু ক্রয় করি। অন্য বছরের তুলনায় এ বছর দাম বেশি। তবে দাম বেশি হলেও পছন্দেরটা কিনতে পেরেছি।’
হাটে গরু কিনতে যাওয়া মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘গজারিয়া হাটে ছোট বড় সব ধরনের গরু পাওয়া যায়। বিশেষ করে চরের দেশী প্রাকৃতিক উপায়ে লালন পালন করা গরুগুলো দেখতে ভালো লাগে দামও সাধ্যের মধ্যে। কোন ধরনের উটকো ঝামেলা নাই।’
মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর চাচাতো ভাই জামাল মিয়া জানান, প্রায় আড়াইশ বছর পূর্বে তাদের পূর্ব পুরুষ আরব আলী মিঞা কোরবানির পশু কিনতে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাংলাবাজার খাষেরহাট নামক পশুর হাটে যায়। তার পছন্দের পশু কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় পশু কেনার খাজনার বিড়ম্বনায় পড়েন তিনি। খাজনা আদায়কারী তার কাছে খাজনার টাকা দাবি করায় বিষয়টি তার আত্মসম্মানে আঘাত করে।
তিনি আরও জানান, খাজনার বিড়ম্বনার শিকার হয়েই তাদের মিঞা বাড়ির সামনের বিশাল মাঠে খাজনা মুক্ত পশুর হাট বসান। সেই থেকেই সম্পূর্ণ খাজনা মুক্ত, জেলার অন্যতম কোরবানির পশুর হাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।