দৈনিক ভোলা টাইমস্
|
দৌলতখান মনপুরা কৃষি

ভোলায় বিশ্বব্যাংকের ঋণে নির্মিত ২৩ কোটি টাকার ভবন এখন ‘গলার কাঁটা’

ভোলায় বিশ্বব্যাংকের ঋণে নির্মিত ২৩ কোটি টাকার ভবন এখন ‘গলার কাঁটা’
  নাসির লিটন, ভোলা:

ভোলায় বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় নির্মিত মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও সার্ভিলেন্স চেকপোস্টের বড় বড় দালান এখন ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় মৎস্য বিভাগের। প্রায় ২৩ কোটি টাকার এ প্রকল্পের নির্মাণকাজেও ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলেদের উন্নয়নে মেঘনার তীরে নির্মিত ভবনগুলো অকেজো পড়ে আছে। আসছে না সুবিধোভোগীদের কোনো কাজেই। নেই রক্ষণা-বেক্ষণের কোনো জনবল বা বাজেট। এ ছাড়া যে ঘাটে অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে আসে না জেলের নৌকা-ট্রলার। নেই আসা যাওয়ার জন্য সহজ রাস্তাও। বিপুল টাকায় নির্মিত এই ভবনগুলোর ভবিষ্যৎ করণীয়ও জানে না স্থানীয় মৎস্য বিভাগ। আর বিদেশি ঋণের টাকায় এমন অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে লালমোহনের বুড়ির দোনে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনার তীরেই বিশাল আকৃতির একটি পাকা ভবন। নদীর ঢেউ আছড়ে পড়ছে ওই ভবনের দেয়ালে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। বেড়িবাঁধের বাইরে হওয়ায় কোনো মানুষের আনাগোনা নেই। বড় বড় তালা ঝুলছে ভবনের গেটগুলোতে। যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই।  নেই দেখভালে কেউ।
মৎস্য অধিদফতরের সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিসারিজ প্রকল্প থেকে ভোলা সদর উপজেলার ভবানিপুর গ্রামের (কাঠির মাথা) মেঘনার তীরে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। নবনির্মিত ওই ভবনের সামনেই বিশাল চর থাকায় বড় কোনো নৌযান ভিড়াতে পারছে না। ফলে ওই ঘাটে মাছ খালাস করা বা বেচাকেনা অসম্ভব। এতে শুরুতেই অবতরণ কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। 
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিশ্ব ব্যাংকের ঋণের টাকায়, সদর উপজেলার ভবানিপুর গ্রামে ও লালমোহন উপজেলার বুড়ির দোন মাছঘাটে দুটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একই প্রকল্পের আওতায় চরফ্যাসন উপজেলার চর কচ্ছপিয়ায় সার্ভিলেন্স চেকপোস্ট, চিংড়ি হ্যাচারি ও পন্টুন নির্মাণ করা হয়েছে। এর নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২৩ কোটি টাকা। এতে জেলেদের বিশ্রামাগারসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই। নির্মাণ শেষে চলতি বছরের মার্চ মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনগুলো স্থানীয় মৎস্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয়দের।
চুক্তি অনুযায়ী জেনারেটর, মিনি হিমাগার, ডিজিটাল স্কেল, বরফ প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থাসহ মূল্যবান মেশিনারি না দিয়েই বিল তুলে নেন ঠিকাদার। এ ছাড়া ভবনের স্থান নির্ধারণ নিয়েও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। 
 
ঘাটের জেলে মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘কাঠির মাথায় ৩০ থেকে ৪০টি ছোট নৌকা ও ট্রলার রয়েছে। এরা দৈনিক ২/৩ হাজার টাকার মাছ পায়। ওই মাছ বেচা-কেনার জন্য বড় ভবন আর বিশাল আয়োজনের কোনো দরকার নাই। এটা চালু হলেও জেলেরা এখানে মাছ বিক্রি করতে আসবেন না।’
কারণ হিসাবে তিনি জানান, এ ভবনে মাছ বিক্রি করলে সরকারি ট্যাক্স দিতে হবে। দরিদ্র জেলেরা নদীর পাড়েই মাছ বিক্রি করতে পারেন, তাহলে কেন খালি খালি ট্যাক্স দিয়ে এখানে বিক্রি করতে আসবেন? এমন প্রশ্ন তার। 
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওই ঘাটের আড়ত মালিক মো. সিরাজ মালের। তিনি জানান, এটা যে পরিবেশে তৈরি করেছে তা ব্যবসায়ী ও জেলেদের কোনো কাজে আসবে না। কারণ মাছ বিক্রির যে প্রক্রিয়া তারা অনুসরণ করে তা ওই ভবনে নেই। কেন এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে; তা বোঝে না তারা। 
জেলে মিজান জানান, চালুর আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সঠিকভাবে ইটবালু দেয়া হয়নি। নির্মাণের সময় মৎস্য বিভাগের কোনো তদারকি ছিল না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে তাদের ইচ্ছা মতোই কাজ করেছে।
স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও জমিদাতা মো. মনির খান জানান, যেভাবে কাজ করার চুক্তি করেছে তার অনেক কিছুই হয়নি। কথা ছিল অবতরণ কেন্দ্রে জেনারেটর, স্কেল, বরফকল, হিমাগার, কমিউনিটি সেন্টার করার। কিন্তু এর কিছুই নেই। নির্মাণকাজ নিয়েও তার অনেক অভিযোগ। উদ্বোধনের আগেই সিঁড়ির টাইলস উঠে যাচ্ছে। পানির ট্যাংক লিক করে পানি বেড় হচ্ছে। গভীর নলকূপ ও পানি বিশুদ্ধ করার ব্যবস্থা সঠিকভাবে করা হয়নি। নৌকা-ট্রলার ভিড়ানোর জন্য ভবন ও সিঁড়ির সঙ্গে রেলিং দেয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি।
মনির খানের দাবি, এটা জেলেদের কোনো কাজে আসবে না। সমিতির মাধ্যমে অবতরণ কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও তাও করা হয়নি। জেলেদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না বসালেও মৎস্য অফিসারদের জন্য বরাদ্দের রুমে এসি লাগানোর বিষয়টি নিয়ে উপস্থিত জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 
ওই ভবনটিও যথাযথভাবে নির্মাণ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় জেলে আবদুল মতিন, সৈয়দ আহাম্মদ, মিরাজসহ অনেকের। তাদের অভিযোগ, অবতরণ কেন্দ্র দুটিতে প্রায় ১৩ কাটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানান ঠিকাদার। এ ছাড়া চর কচ্ছপিয়ার সার্ভিলেন্স চেকপোস্ট, চিংড়ি হ্যাচারি ও পন্টুনে আরও ১০ কোটি টাকা খরচের তথ্য মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে।
তবে অনিয়মের বিষয়ে অস্বীকার করে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ওপর দায় চাপিয়ে উল্টো নিজের অতিরিক্ত টাকা খরচের দাবি ঠিকাদার মো. শহিদুল ইসলামের।
তিনি জানান, সদর উপজেলার ভবানিপুর অবতরণ কেন্দ্রে এক কোটি টাকা ও লালমোহনের বুড়ির দোন কেন্দ্রে প্রায় তিন কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়েছে; যা রিভাইজের জন্য কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছেন। যার অনুমোদন না হওয়ায় তিনি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেন।
মেশিনারি ও যন্ত্রপাতি না দেয়ার বিষয়ে শহিদুল ইসলাম বলেন, বরাদ্দের মধ্যে যা যা ছিল তা দিয়েছেন। মৎস্য বিভাগের একাধিক ইঞ্জিনিয়ার কাজের তদারকি করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। 
এ দিকে বিপুল পরিমাণ টাকায় ভবন নির্মাণ হলেও ভোলা জেলা মৎস্য অফিসে এর কোনো তথ্য নেই। নির্মাণ খরচ, কাজের ডিজাইন বা করণীয় কোনো বিষয়ে তথ্য দিতে পারেনি জেলা ও উপজেলা মৎস্য অফিস।
মৎস্য অধিদফতরের ওয়েবসাইটে এ প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়েছে দেখানো আছে। ওয়েবসাইটেও ব্যয়-বরাদ্দের কোনো তথ্য নাই। বাস্তবায়ন কাল হিসেবে প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাইতে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা।
তবে ভোলা জেলা মৎস্য অফিসার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গত ১২ মার্চ স্থাপনাগুলো কাগজপত্রে বুঝে নিয়েছেন। কাজের কোনো ডিজাইন ও মালামালের কোনো তালিকাও তাকে দেয়া হয়নি। পুরো কাজের তদারকি করেছেন প্রকল্প দফতর।
ভুল স্থান নির্ধারণসহ অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি ৬ থেকে ৭ মাস। তার আগেই এর কার্যক্রম, সাইড সিলেকশন আগেই করেছেন। ভবন হস্তান্তর হলেও এখনো কোনো জনবল বা রক্ষাণাবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নাই।’ 
ভবনগুলো চালু করার প্লান আছে উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, সেটা এখনও পক্রিয়াধীন। কোনো কাগজপত্র জেলা অফিসে নেই বলেও তিনি জানান।
সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিসারিজ প্রকল্পের ১০টির মধ্যে ভোলায় দুটি অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। আর চর কচ্ছপিয়ায় সার্ভিলেন্স চেকপোস্টে স্পিডবোট বরাদ্দ থাকলেও চালক নেই।