ভোলায় বাল্যবিবাহকে ‘লাল কার্ড’ দেখালেন শিক্ষার্থীরা
ষ্টাফ রিপার্টার:
ভোলায় বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার আয়োজনে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছে শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ‘বাল্যবিবাহকে লাল কার্ড প্রদর্শন’ শিরোনামে আয়োজিত এ কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় এবার থামাতে হবে বাল্যবিবাহ। মানবিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সচেতনতার আলোয় গড়ে উঠুক নিরাপদ ভবিষ্যৎ এই প্রত্যয় নিয়েই ভোলায় এ সচেতনতামুলক কর্মসূচির আয়োজন করে বসুন্ধরা শুভসংঘ। অনুষ্ঠানে ভোলা জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। তারা হাতে লাল কার্ড নিয়ে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। প্রতীকী এই ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বোঝাতে চেয়েছে-যেমন খেলাধুলায় নিয়ম ভঙ্গ করলে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়, তেমনি সমাজ থেকে বাল্যবিবাহকেও চিরতরে বিতাড়িত করতে হবে। এসময় বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মো. শাফায়াত হোসেনের (সিয়াম) সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাছির মাঝি ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার আমিনুল্লাহ, সহকারী শিক্ষক ইউসুফ, ছাইফুল্লাহ, জিয়াউর রহমান, বিবি খাদিজা, রাশিদা বেগম, সুলতানা নাসরিন, মাহে আলম, শিক্ষক মোস্তফা ও রিদওয়ানুল্লাহ। আরও উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি মীর আবিদ হোসেন রাফি, সাধারণ সম্পাদক ইসরাত জাহান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইফাজ হোসেন, মো. জামিলুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক হৃদয় দত্ত, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুর রহমান, কর্ম ও পরিকল্পনা সম্পাদক ইসরাত জাহান নুহা, অর্থ সম্পাদক সাফা ইসলাম, দপ্তর সম্পাদক নুর ফাতেমা, ইভেন্ট সম্পাদক তানভির আহমেদ, কার্যকরী সদস্য রাফিয়া ইসলাম, খায়রুন নাহার, নাজমুন বেগম সহ বসুন্ধরা শুভসংঘের সদস্যরা ও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে উঠে আসে নানা স্লোগান-“না বলি বাল্যবিবাহকে”, “১৮ বছরের আগে নয় বিয়ে”, “শিক্ষাই হোক জীবনের মূল শক্তি”, “বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ি”। তাদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ পুরো কর্মসূচিকে করে তোলে প্রাণচঞ্চল ও তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষকরা বলেন, শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি শুধু একটি কর্মসূচি নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা। তারা অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সন্তানদের শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে এবং বাল্যবিবাহের মতো ক্ষতিকর প্রথা থেকে দূরে রাখতে হবে।’ বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মো. শাফায়াত হোসেন (সিয়াম) বলেন, ‘বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের একটি বড় সামাজিক সমস্যা। এর ফলে কিশোরী মেয়েরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকিতে পড়ে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার বিভিন্ন আইন ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তার পাশাপাশি এই সমস্যা সমাধানে দরকার সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ। শিক্ষার্থীরাই পারে সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত হতে। তাদের এই সচেতনতা ও প্রতিবাদই একদিন বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তোমাদের এই সচেতনতা ও সাহসী অবস্থান সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠবে। বাল্যবিবাহের মতো কুপ্রথার বিরুদ্ধে তোমাদের সোচ্চার ভূমিকা আমাদের আশাবাদী করে তোলে।’ বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইফাজ বলেন, ‘অল্প বয়সে বিয়ে হলে কিশোরীরা প্রায়ই শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ে, যা তাদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। একই সঙ্গে, অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়, অপুষ্টি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দেয়। ফলে একটি সুস্থ ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি হয়।’ শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা আজ লাল কার্ড দেখিয়ে জানাতে চাই বাল্যবিবাহ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের আগে পড়াশোনা শেষ করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ বসুন্ধরা শুভসংঘের কর্ম ও পরিকল্পনা সম্পাদক ইসরাত জাহান নুহা জানান, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে, যাতে সমাজ থেকে বাল্যবিবাহসহ সব ধরনের কুপ্রথা দূর করা যায়।’ স্থানীয় অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান। তারা মনে করেন, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করে তোলে।