দৈনিক ভোলা টাইমস্
|
দৌলতখান কৃষি

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ঘরে থেকে মরা ছাড়া কোনো উপায় নেই ভোলার চরাঞ্চলের লাখো মানুষের

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ঘরে থেকে মরা ছাড়া কোনো উপায় নেই ভোলার চরাঞ্চলের লাখো মানুষের
  নাসির লিটন:

দুর্যোগ মৌসুমের শুরুতেই নিরপত্তা শঙ্কায় ভুগছে উপকূলীয় ভোলার চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী ২১ টি চরের ৯টিতেই নেই কোনো আশ্রয়কেন্দ্র। বাকি ১২ টিতে আছে নামমাত্র ২/১টি করে আশ্রয় কেন্দ্র। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এদিকে জেলার ২০ লাখ মানুষের দুযোগে আশ্রয়ের জন্য ৯শ’ স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে তাতে আশ্রয় মিলবে মোট বসতির চারভাগের একভাগ। বাকি তিনভাগ মানুষ থেকে যাচ্ছে অরক্ষিত।

দৌলতখান উপজেলার মেঘনার মধ্যবর্তী মদনপুর ইউনিয়নের চরমুন্সি গ্রামে সাড়ে ৪ হাজার মানুষের বসবাস। কৃষি নির্ভর এ চরে রয়েছে কয়েক হাজার গরু -মহিষ। কিন্তু প্রাকৃতিক দুযোগে আশ্রয় নেয়ার মতো নেই কোনো সাইক্লোন শেল্টার বা মাটির কিল্লা। ফলে অনিশ্চিত জীবনে সৃষ্টি কর্তার উপর ভরসা রেখেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা করতে হয়।
 
ব্যবসায়ী মিলন পাটোয়ারী জানান, বর্ষার দুর্যোগে মেঘনার পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৭/৮ ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হয়। এসময় পুরো চর প্লাবিত হয়। ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। তখন গবাদি পশু নিয়ে তারা অসহায় জীবন-যাপন করে। স্রোত বাড়লে ঘরবাড়ির পাশাপাশি গরু-ছাগলও ভাসিয়ে নেয়।
 
তারা সম্পূর্ণ অনিরাপদ দাবি করে তিনি বলেন, নদী ভাঙ্গা দরিদ্র পরিবাররাই এখানে বসবাস করেন। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু এদের দুর্যোগে আশ্রয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। 
 
সরেজমিনে দেখা যায়, চরের চারদিকে মেঘনার অথৈই পানি। এর মধ্যে ছোট ছোট কাঁচাঘর আর সরকারি আশ্রয়নে মানুষের বসবাস। যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। বর্ষায় ছোট নৌকা তাদের চলাচলের একমাত্র অবলম্বন। শুষ্ক মৌসুমে খোলা মাঠ আর নালা ডোবায় পায়ে হেটেই পাড়ি দিতে হয় গন্তব্যে।
 
চরমুন্সির কৃষাণি মরিয়ম বিবি জানান, একটানা কয়েকদিন ঝড়- বাদল থাকলে তাদের ঘরেই বন্দি থাকতে হয়। বের হবার কোনো উপায় থাকে না। ‘আল্লাহর উপর ভরসা’ করেই মোকাবেলা করতে হয় বৈরি আবহাওয়ায়। নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে শেষ আশ্রয় চরমুন্সিতে।
 
স্থানীয় তথ্যানুযায়ী সাগরকূলের ঢালচর, পূর্ব ঢালচর, মেঘনার মধ্যবর্তী চর লাদেন, চর লক্ষ্মী, হাজিপুর, চর সামসুদ্দিন, কাজিরচর, চর সুলতানি, তেতুলিয়ার মধ্যবর্ধী চর কচুয়াখালীতে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। এসব চরে বসতির সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক। এছাড়া প্রয়োজনীয় শেল্টারের অভাবে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া মধ্যবর্তী ২১টি চরের বাসিন্দাদের অর্ধেকের বেশি ঝড় বাদলে নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে থেকে যায়। খড়কুটোর করা নাজুক কাঁচা ঘরই ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবেলায় এদের একমাত্র ভরসা। এছাড়া শেল্টার সংকট রয়েছে মূল ভূখন্ডের নদীর তীরের এলাকাগুলোতেও।  
 
মূল ভূখন্ড থেকে বিছিন্ন দুর্গম চর নিজামের ৩ হাজার মানুষের জন্য ১টি, কলতলির চরের ২০ হাজার মানুষের জন্য ২টি, চর মোজাম্মেলে ৭ হাজার মানুষের জন্য একটি, মেদুয়া ৫ হাজার মানুষের জন্য ২টি, মদনপুরের ১০ হাজার মানুষের জন্য ২টি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে।
 
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরের তথ্যমতে, ভোলা সদর উপজেলার প্রায় ৫ লাখ মানুষের জন্য ১৩৭টি, দৌলতখানের ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষের জন্য ১১২টি, বোরহানউদ্দিন উপজেলার ২ লাখ ৬৫ হাজার বাসিন্দার জন্য ১২২টি, তজুমদ্দিন উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য ৭৬টি, লালমোহন উপজেলার ২লাখ ৮৩ হাজার মানুষের জন্য ১৯৮টি, চরফ্যাসন উপজেলার ৪ লাখ ৫৬ হাজার মানুষের জন্য ১৬৫টি ও সাগরকূলের মনপুরা উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের ৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের অধীন জেলায় আরও ১৫টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে।
 
মেঘনার মধ্যবর্তী মনদপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন জানান, যুগ যুগ ধরে অরক্ষিত চরের এসব বাসিন্দাদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা জরুরি। মেঘনায় মাছ ধরা আর গবাবি পশু পালন করেই চলে তাদের জীবিকা। তার ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ২টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর মধ্যে চরমুন্সির সাড়ে ৪ হাজার মানুষের জন্য একটিও নেই। তাই এদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র বাড়ানো জরুরি।
 
সাগরকূলের ঢালচরের বাসিন্দা রফিক ফরাজি জানান, দুর্যোগ শুরু হলে গবাদি পশু রেখে অনেক পরিবার অন্যত্র যেতে চায় না। দুর্যোগ সংকেত ৮ থেকে ১০ হলে প্রশাসনের পক্ষে এসব মানুষ সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না। কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন, তখন নদীতে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না। এমন পরিস্থিতে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বা ঘরে বসে প্রাণ দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। 
 
জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, যেসব চরাঞ্চালে সাইক্লোন শেল্টার নাই সেগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেল্টার নির্মাণ করা হবে। দুর্যোগে যেন সবাইকে আশ্রয়ের আওতায় আনা যায় সে লক্ষ্যে কাজ চলছে। আর যে আশ্রয় কেন্দ্র আছে সেগুলোকে ব্যবহার উপযোগি করার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
 
জেলার সাত উপজেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য ৯১৯টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে।